Friday, September 30বাংলারবার্তা২১-banglarbarta21
Shadow

বিএম ডিপো যেন এক মুত্যুকুপের নাম আগুনের অগ্নিশিখা প্রায় ২দিনেও নিয়ন্ত্রনের বাহীরে

চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ আগুনে রীতিমতো মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। গত শনিবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রায় ২৫ ঘণ্টা পর গতকাল রাতে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এরই মধ্যে আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত থাকা ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের ৯ জন সদস্যসহ মোট ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক। স্মরণকালের ভয়াবহ এই অগ্নিকান্ডের লেলিহান শিখা গ্রাস করেছে বিপুল আমদানি-রপ্তানি পণ্য, কাভার্ডভ্যান, ট্রাক, কেমিক্যাল শেড। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় আশপাশের লোকারণ্যে সৃষ্টি হয় ভীতিকর পরিবেশ। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে যোগ দেন সেনা সদস্যরাও। ঢাকা থেকে মোতায়েন করা হয় বিশেষ টিম। আগুনে প্রাণহানির ঘটনায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকার শিরিন শারমীন চৌধুরী শোক প্রকাশ করেছেন।
চট্টগ্রাম বিএম ডিপোতে আগুনে দগ্ধ হওয়া রুগিকে এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিড পয়েন্ট হাসপাতাল ও সিএমএম হাসপাতাল সহ এবং আরো যেগুলো চিকিৎসা সেবা দিতে পারবে তাদের সকলকে সরকারীভাবে নির্দেষনা প্রদান করা হয়েছে।

বিএম ডিপোতে আগুনে পুড়ে যাওয়া গুরুতর অবস্থায় ফায়ার সার্ভিসের দুজন এবং অন্য সাতজনকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নেওয়া হয়। রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। আহত ও তাদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, সিএমএইচসহ বিভিন্ন হাসপাতালের পরিবেশ। ফায়ার সার্ভিস বলছে, লাশের সারি আরও দীর্ঘ হতে পারে। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। দফায় দফায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও আগুনের লেলিহান শিখায় আতঙ্কিত হয় ডিপোর আশপাশের তিন গ্রামের বাসিন্দারা। ঘটনার কারণ তদন্তে গঠন করা হয়েছে সরকারি-বেসরকারি পাঁচটি তদন্ত কমিটি।
চট্টগ্রাম শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দুরে সীতাকুন্ডের সোনাইছড়ির শীতলপুরের এই কনটেইনার ডিপো বা ড্রাই পোর্টে গত শনিবার রাত সাড়ে ৮টা থেকেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। রাত পৌনে ১১টা নাগাদ বিকট বিস্ফোরণ হয়। এ সময় আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকায় ভীতিকর অবস্থা তৈরি হয়।

আগুন লাগার পর অনেক দূর থেকে আগুনের লেলিহান শিখা দেখে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় হাজারো মানুষ। উৎসুক মানুষের ভিড় ঠেলে অগ্নিনির্বাপণে হিমশিম খেতে হয় ফায়ার সার্ভিসসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। সংকট নিরসনে দ্রুত র‌্যাব, পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নিলেও অঘটন ঠেকানো যায়নি। রাতভর একের পর এক বিস্ফোরণ হতে থাকে হাইড্রোজেন পারক্সাইড বোঝাই কনটেইনার ও কাভার্ডভ্যানসহ পণ্যবোঝাই যানবাহন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালনে ছুটে যাওয়া ৯ ‘ফায়ার ফাইটার’ প্রাণ হারান। পা হারান এক পুলিশ সদস্য। আশপাশ থেকে ছুটে আসা উৎসুক মানুষও উদ্ধার অভিযানকালে দফায় দফায় রাসায়নিক বিস্ফোরণে হতাহত হন। রাত যতই বাড়তে থাকে ঘটনাস্থল থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও বাড়তে থাকে স্বজনহারাদের ভিড়। অনেকে ছুটে আসেন তাদের খোঁজে। তরুণ যুবক অনেকেই ছুটে আসেন প্রয়োজনীয় রক্ত, ওষুধসামগ্রী প্রদানসহ এই দুর্যোগে সহযোগিতায়। দুঃসহ দম বন্ধ পরিবেশেও তৈরি হয় এক মানবিকপ্রীতির পরিবেশ। এমন ঘটনা স্মরণকালেও ঘটেনি চট্টগ্রামে। রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি অরাজনৈতিক বিভিন্ন সংগঠনের অনেকেই ছুটে যান হাসপাতালে।

এদিকে গতকাল রবিবার বিকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল সাইফুল আবেদীন। তিনি বলেন, ‘আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সেনাবাহিনীর ২০০ সদস্য কাজ করছেন। আগুন এখন মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নতুন করে আর ছড়াতে যেন না পারে সেজন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আশা করছি রাত ১০টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।’

রবিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সীতাকুন্ডের সংঘটিত দুর্ঘটনার খবর পেয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সব বাহিনীকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, সংকটাপন্ন ৮ রোগীকে হেলিকপ্টারে শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশসেরা চিকিৎসক ডা. সামন্ত লাল সেন ও তাঁর টিম আগামীকাল (আজ) সকালের প্রথম ফ্লাইটে চট্টগ্রামে এসে রোগীদের চিকিৎসার কাজ শুরু করবেন। শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২ লাখ টাকার চেক দেওয়া হবে। এরই মধ্যে ১৩ জনের পরিবারকে টাকা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে নিহতদের ৫০ হাজার ও আহতদের ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ এ ড্রাই পোর্টে আগুন এবং বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত ১১০ মিলিয়ন ডলার বা হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন পোর্ট ইউজার্স ফোরাম সভাপতি এবং চট্টগ্রাম চেম্বার প্রধান মাহবুবুল আলম। তিনি জানান, ডিপোটিতে প্যাসিফিক জিন্সসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানি পণ্য ছিল।

জানা গেছে বিস্পোরক বাহী একটি লরী থেকে সীতাকুন্ডের সোনাইছড়ির শীতলপুরের এ কনটেইনার ডিপো বা ড্রাই পোর্টে গত শনিবার রাত সাড়ে ৮টা থেকেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। রাত পৌনে ১১টা নাগাদ বিকট বিস্ফোরণ হয়। এ সময় আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকায় ভীতিকর অবস্থা তৈরি হয়।

আগুন লাগার পরদিন সকাল ৯টার দিকে বিএম কনটেইনার ডিপো পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান। পরিদর্শনের পর বেলা ১১টার দিকে গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি বলেন, ডিপোতে এখনো অক্ষত থাকা হাইড্রোজেন পারক্সাইডসহ রাসায়নিক পণ্যভর্তি কয়েকটি কনটেইনার সরিয়ে নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মালিকপক্ষ ও কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। অক্ষত কনটেইনারে আগুন ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ডিপোতে হাইড্রোজেন পারক্সাইডবাহী ২৬টি কনটেইনার ছিল। ডিপোর টিনশেডেও প্লাস্টিকর জারে এই রাসায়নিক ছিল। আগুন লাগার পর কনটেইনারে থাকা রাসায়নিকভর্তি জার ফেটে যায়। এতে হাইড্রোজেন পারক্সাইড বের হয়ে কনটেইনারের সংস্পর্শে আসে। অক্সিজেন নির্গত হয়ে পানি ও আগুনের সংস্পর্শে কনটেইনারের ভিতরে তাপমাত্রা বেড়ে বিস্ফোরণ ঘটে। কনটেইনার ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে স্পিøন্টারের মতো তা ছড়িয়ে পড়ে। শনিবার রাতে সীতাকুন্ডের ভাটিয়ারী এলাকার বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পরে ইউনিট আরও বাড়ানো হয়। এখন ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিটের ১৮৩ কর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন।

চট্টগ্রাম সিতাকুন্ডে আগুন লাগার ঘটনা তদন্তে পাঁচ কমিটি : বিএম ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড এবং বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্ত করতে পৃথক চারটি কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বিএম কনটেইনার ডিপো কর্তৃপক্ষ। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল রেজাউল করিমকে প্রধান করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে ফায়ার সার্ভিস। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক বদিউল আলমকে প্রধান করে ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে চট্টগ্রাম কাস্টমস। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে চট্টগ্রাম বন্দর। তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে বিএম কনটেইনার ডিপো কর্তৃপক্ষও।

এদিকে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে অগ্নিকান্ডে হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের মানবিক সহায়তা হিসেবে নগদ ১ কোটি টাকা এবং ১ হাজার শুকনা ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গতকাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে এ বরাদ্দ দেওয়া হয়। সীতাকুন্ডের কনটেইনার ডিপোয় আগুন ও ভয়াবহ বিস্ফোরণে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। শনিবার রাত ৯টার দিকে সীতাকুন্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নে বিএম কনটেইনার ডিপোর লোডিং পয়েন্টের ভিতরে আগুন লাগে। কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। রাত পৌনে ১১টার দিকে এক কনটেইনার থেকে অন্য কনটেইনারে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। একটি কনটেইনারে রাসায়নিক থাকায় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৪ কিলোমিটার এলাকা কেঁপে ওঠে।

এদিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের শীতলপুরের বিএম কন্টেইনারের ডিপোর আগুন এবং বিস্ফোরণের প্রভাব পড়েছে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকায়। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে ভেঙে গেছে ওই সব এলাকার কাঁচের দরজা, জানালা। নষ্ট হয়েছে গেছে ঘরে থাকা টিভি ফ্রিজ, ফ্যানসহ বৈদ্যুতিক নানান সরঞ্জাম। বিস্ফোরণের পর থেকো কালো ধোঁয়া এবং রাসায়নিক পদার্থের পোড়া গন্ধে চরম অস্বস্তিতে পড়েছেন কয়েক গ্রামের বৃদ্ধ এবং শিশুরা। রবিবার সকালে সোনাইছড়ি ইউনিয়নের শীতলপুর, কেশবপুর, মোল্লাপাড়া, লালবাগসহ বিভিন্ন এলাকার লোকজনের সাথে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়।

সোনাইছড়ি ও শীতলপুর এলাকার আবদুল করিম বলেন, বিস্ফোরণের বিকট শব্দে অনেক ঘরের কাঁচের দরজা এবং জানালা ভেঙে যায়। নষ্ট হয়ে যায় বৈদ্যুতিক নানা সরঞ্জাম। ক্যামিকেল পোড়া গন্ধ এবং কালো ধোয়ার কারণে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published.