
বার্তা প্রতিনিধি: বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে তাই আইনশৃঙ্খলার বাহিনী তথা পুলিশকে হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। খোদ রাজধানীতেই পুলিশকে লক্ষ্য করে গত কয়েক মাসে একের পর এক শক্তিশালী বোমা হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। প্রশ্ন উঠেছে, কেন পুলিশ সদস্যদের টার্গেট করা হচ্ছে। কারা এসব ঘটনায় জড়িত? দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশের মনোবল ভেঙে দেয়া ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতেই এমন হামলা চালানো হতে পারে। এছাড়া গুলশানে আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে পুলিশ যেভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সন্ত্রাস জঙ্গিবাদকে রুখে দিয়েছে সে কারণেই পুলিশ টার্গেট হতে পারে।
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!এদিকে অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজ বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পুলিশের ওপর দুই কারণে হামলা হতে পারে। একটি হচ্ছে সাধারণ মানুষের সহায়তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালিয়েছে, তাতে জঙ্গিরা সুবিধা করতে পারছে না। ফলে তারা পুলিশের ওপর হামলা করে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চাইছে। আরেকটি হচ্ছে, দেশে রাজনৈতিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে পুলিশের ভ‚মিকা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক আছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থার সঙ্কট রয়েছে। জঙ্গিরা সুযোগটি কাজে লাগাতে চাইছে।
সূত্রমতে জানা যায়, রাজধানীতে গত পাঁচ মাসে পুলিশকে লক্ষ্য করে তিনটি বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার রাত সোয়া নয়টার দিকে ধানমণ্ডি সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের গাড়িবহর যাওয়ার সময় বোমা হামলা চালানো হয়। কয়েকগজ দূরে পুলিশ বক্সকে টার্গেট করে এ হামলা চালানো হয় বলে দাবি ডিএমপি কমিশনারের।
তার কয়েকদি আগে রাজধানীর মালিবাগে ২৬ মে পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা হামলা ও ২৯ এপ্রিল গুলিস্তানে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল ছোড়া হয়। এসব হামলায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
তবে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী কথিত ‘আইএস’ এর নাম ভাঙ্গিয়ে এসব হামলার পর দায় স্বীকার করা হয়। তবে দেশে কোনো আইএস নেই বলে বরাবরই বলে আসছেন সরকার ও পুলিশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। তাদের মতে, এসব হামলায় স্থানীয় জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা কিংবা দেশীয় কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত থাকতে পারে। তবে মালিবাগ ও গুলিস্তানের ঘটনার কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। হামলার জড়িতদের গ্রেফতারও করতে পারেনি পুলিশ।
গত শনিবার রাতে সায়েন্সল্যাব মোড়ে পুলিশ বক্সের সামনে বোমা হামলায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর গাড়িবহরে থাকা এএসআই শাহাবুদ্দিন (৩৫) ও কনস্টেবল আমিনুল (৪০) আহত হন। রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে পুলিশই হামলার টার্গেট ছিল বলে মন্তব্য করেন ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ধারণা করছি পুলিশ বক্সে থাকা পুলিশ সদস্যরাই মূল টার্গেট ছিল। যেখানে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়েছে তার ১০ গজ পেছনে পুলিশ বক্স। ভাগ্যক্রমে রোড ডিভাইডারের কাছাকাছি ককটেলটি বিস্ফোরিত হওয়ায় স্পিøন্টার দূরে গিয়ে আঘাত করতে পারেনি। যে কারণে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। পুলিশ কমিশনার বলেন, হলি আর্টিজানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে পুলিশ সারাদেশে যেভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সন্ত্রাস জঙ্গিবাদকে রুখে দিয়েছে সে কারণেই পুলিশ টার্গেট হতে পারে।
ঐসময় বোমা হামলা হওয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, হাতে তৈরি বোমা বা আইইডি বিস্ফোরণে পুলিশের দুই সদস্য আহত হয়েছেন। এরআগে রাজধানীর মালিবাগ ও গুলিস্তানের পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলার সঙ্গে এবারের ঘটনার সামঞ্জস্যতা রয়েছে। তিনি বলেন, তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যাবে কেন এ হামলা ও কারা এর সঙ্গে জড়িত। বোমা হামলার ঘটনায় সারাদেশের পুলিশকে বাড়তি সতর্কে থাকার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এছাড়াও গত ২৯ এপ্রিল গুলিস্তানে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল ছোড়া হয়। এতে ট্রাফিক কনস্টেবল নজরুল ইসলাম (৩৭), লিটন (৪২) ও কমিউনিটি পুলিশ মো. আশিক (২৮) আহত হন। এরপর ২৬ মে মালিবাগে সিআইডি অফিসের বিপরীতে পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা হামলার ঘটনায়ও ট্রাফিক পুলিশের এএসআই রাশেদা আক্তার বাবলী (২৮) ও রিকশাচালক লাল মিয়া (৫৫) আহত হন। এছাড়া ২৩ জুলাই রাতে রাজধানীর পল্টন মোড় ও খামাড়বাড়ি পুলিশ বক্সের কাছে ফেলে রাখা বোমা উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনার পর দায় স্বীকার করে কথিত আইএসের নামে বিবৃতি দেয়া হয়। তবে এ দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছেন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা।
দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশের একধিক কর্মকর্তা জানান, জঙ্গিরা পুলিশকে টার্গেট করেছে এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। ‘লোন উলফ’ (কাপুরুষের মতো রাতের আঁধারে নিরীহদের ওপর আক্রমণকারী) জঙ্গিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে পুলিশকে টার্গেট করে হামলার সুযোগ খুঁজছে। আর এমন তথ্যের পর সারাদেশে বাড়তি সতর্ককতা জারি করা হয়। এর মধ্যেই সায়েন্সল্যাব মোড়ে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ফুটওভার ব্রিজ থেকে কোনো দুর্বৃত্ত বোমাটি ছুড়ে মেরে পালিয়ে যায়।
তবে চলতি বছর পুলিশের ওপর কয়েকটি হামলার ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশকে কেন টার্গেট করেছে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিরা? নিরাপত্তা, সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাগাতার সফল অভিযানে বিপর্যস্ত জঙ্গিরা পুলিশকে টার্গেট করে প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের অবস্থান ও শক্তির জানান দিতে চাইছে।
খোদ রাজধানী ঢাকার পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, আমরা তদন্ত করছি, কারা এর সঙ্গে জড়িত, কি উদ্দেশ্যে এটা করেছে বের হয়ে যাবে। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, পুলিশের মনোবল দুর্বল করার জন্য এ ধরনের অপচেষ্টা করা হচ্ছে, ভীতি তৈরি করা হচ্ছে। তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড দিয়ে পুলিশের মনোবল ভেঙে দেয়া যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে নিরপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, পুলিশ যেহেতু জঙ্গি দমনে সফলভাবে কাজ করছে তাই তারা পুলিশকে প্রতিপক্ষ ভেবে টার্গেট করতে পারে। এছাড়া আইএসের মতাদর্শে বিশ্বাসী দেশীয় কিছু জঙ্গি সংগঠন ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করতে বা নিজেদের অবস্থান জানান দিতে এ কাজ করে থাকতে পারে।
এদিকে পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) মো. সোহেল রানা বলেন, পুলিশ সদর দফতর এই বিষয়ে দৃষ্টি রাখছে। ডিএমপিসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে করণীয় বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া সারাদেশে পুলিশের সব ইউনিটকে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রত্যেকটি হামলার ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলাগুলো তদন্তাধীন। কারা এসব হামলায় জড়িত তদন্ত শেষে ও সংগ্রহিত আলামত পরীক্ষায় বেরিয়ে আসবে।
সূত্র: মানবকণ্ঠ

