Saturday, June 20বাংলারবার্তা ২১-banglarbarta21
Shadow

বিরোধী দলের পদ নিয়ে কাদের রৌশন দ্বন্ধ চরমে

শেখ আবীর: বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দলের নেতার পদকে ঘিরে জাতীয় পার্টিতে আবারো শুরু হয়েছে রশি টানাটানি। দলের চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর পদটি শূন্য হয়। তারপর থেকে দলের চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলের প্রধান কে হবেন এ নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ছিল অস্থিরতা। জাপা চেয়ারম্যানের মৃত্যুর দুই সপ্তাহ পরে পার্টির চেয়ারম্যান পদে জিএম কাদেরকে ঘোষণা দেয়ার পর দলের কয়েকজন নেতা তার বিরোধিতা করলেও কার্যত কিছু হয়নি। কিন্তু বিশেষ করে মঙ্গলবার বিকেলে জিএম কাদেরকে বিরোধী দলের নেতা বানানোর জন্য স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বরারব চিঠি দেয়ার পর নড়েচড়ে বসেছেন রওশনপন্থিরা। এ নিয়ে দলের ভেতর অন্তর্দ্ব›দ্ব এখন তুঙ্গে। রয়েছে দল ভাঙার আশঙ্কাও।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

বিরোধী দলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ আজ বৃহস্পতিবার গুলশানের বাসভবনে বেলা ১১টায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন। স্পিকার বরাবর জিএম কাদেরের দেয়া চিঠি গঠনতন্ত্র সম্মত নয় বলে বুধবার বিকালে স্পিকার বরাবর পাল্টা চিঠি দিয়েছেন রওশন এরশাদ। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা করতে জিএম কাদেরের চিঠি দেয়ার পরদিন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে পাল্টা চিঠি দিয়েছেন তিনি। গতকাল বিকেলে স্পিকারের কার্যালয়ে এ চিঠি পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এতে জিএম কাদেরের চিঠির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তা গ্রহণ না করার অনুরোধ করা হয়েছে। জাতীয় পার্টির এমপি মুজিবুল হক চুন্নু চিঠি দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, আমাদের সিনিয়র চেয়ারম্যান ও বর্তমান সংসদ উপনেতা রওশন এরশাদ গতকাল বুধবার স্পিকারকে একটি চিঠি দিয়েছেন। তবে এতে বিরোধীদলীয় নেতা করার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

মজিবুল হক চুন্নু বলেন, জিএম কাদেরের চিঠিটি যথাযথভাবে পাঠানো হয়নি। সংসদীয় দল বা পার্টির কোনো পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই চিঠি পাঠানো হয়নি, সেটা জানিয়েই এই চিঠি দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির পার্লামেন্টারি কমিটির বৈঠক ছাড়া স্পিকারকে দেয়া জিএম কাদেরের চিঠির কোনো দাম নেই। এর আগে গত মঙ্গলবার জিএম কাদের নিজেকে বিরোধীদলীয় নেতার স্বীকৃতি চেয়ে স্পিকারের কাছে চিঠি দেন। পার্টির প্রেসিডিয়ামের সভা ও সংসদীয় দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যরা জিএম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে মনোনয়নের প্রস্তাব করেছে বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

উল্লেখ্য যে, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গত ১৪ জানুয়ারি মারা গেছেন। এর আগে তিনি তার অবর্তমানে পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে ভাই জিএম কাদের দায়িত্ব পালন করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন, এর কোনো সুরাহা করে যাননি। জিএম কাদেরের চেয়ারম্যান হওয়ার বিষয়টি এরশাদ আগে জানিয়ে গেলেও রওশনপন্থিরা সেটা মেনে নিতে রাজি হননি। ফলে এরশাদের মৃত্যুর পরপরই দলটির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা মনোনয়ন নিয়ে জিএম কাদের ও রওশনপন্থিদের মধ্যে টানাটানি শুরু হয়। দেয়া হয় বিবৃতি, পাল্টা বিবৃতি। অবশ্য জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে মেনে নিতে রওশনপন্থিরা কিছুটা নমনীয় হলেও তাকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে চান না। তাদের দাবি, রওশনই হবেন বিরোধীদলীয় নেতা।

সংসদে বিরোধী দলের পদ শুন্য থাকায় গত মঙ্গলবার জিএম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে ঘোষণা দেয়ার জন্য পার্টির ১৫ জন এমপি স্বাক্ষরিত চিঠিটি স্পিকারের দফতরে পৌঁছেন দেন কাজী ফিরোজ রশীদ। এ সময় জাপার সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী, নাজমা আকতার, শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ, মেজর (অব.) রানা মোহাম্মদ সোহেল ও আদেলুর রহমান ছিলেন। চিঠিতে তারা ছাড়াও আরো স্বাক্ষর করেছেন পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের, মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, অধ্যাপিকা মাসুদা রশিদ চৌধুরী, লে. জে. (অব.) মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী, গোলাম কিবরিয়া টিপু, নুরুল ইসলাম তালুকদার, সালমা ইসলাম ও পনির উদ্দিন আহমেদ।

কোন মাধ্যমে ঐ চিঠির খবর এমপি রওশন এরশাদের কাছে পৌঁছলে তিনি দলীয় এমপিদের মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজ বাসায় আসতে বললেও মাত্র চারজন হাজির হন। গতকাল বুধবার দুপুরেও নিজ অনুসারীদের নিয়ে বৈঠকে বসেন রওশন। সেখানে চারজন এমপি ছিলেন বলে বৈঠক সূত্রে জানা যায়। বৈঠকে উপস্থিত এক নেতা জানান, পার্টি সংসদীয় কোনো সভা ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত কেউ নিতে পারেন না। ম্যাডাম (রওশন) আগামী ৮ তারিখে সংসদে আমাদের সংসদীয় দলের সভা ডেকেছেন। সেখানেই আমরা বিরোধী দলের নেতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।

এদিকে জাতীয় পার্টিতে রওশনপন্থিরা কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে মঙ্গলবার ও গতকাল বুধবার দুই দফা অনেককে ফোন করেও কাছে পাননি রওশন এরশাদ। এ মুহূর্তে তার সঙ্গী হয়েছেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মজিবুল হক চুন্নু ও ফখরুল ইমাম।

অন্যদিক জাতীয় পার্টিতে নতুন করে নেতৃত্ব নিয়ে পারিবারিক বিভেদে অস্থিরতায় ভুগছেন পার্টির তৃণমূল নেতাকর্মী। বিশেষ করে পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর থেকেই পার্টিতে দেবর-ভাবির দ্ব›দ্ব অনেকটাই স্পষ্ট। এর মধ্যে একাধিকবার রওশন ও জিএম কাদের রওশনের গুলশানের বাসভবনে একান্তে কথা বলেন। কিন্তু দুইদিন না যেতেই এ ইস্যুতে আবার তাদের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি হতে থাকে। জিএম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হলে তারও বিরোধিতা করেন রওশন। আসন্ন সংসদ অধিবেশনেই বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হওয়ার কথা। এর আগেই পার্টির অধিকাংশ এমপি জিএম কাদেরকে বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত করার জন্য স্পিকারকে চিঠি দিলে নাখোশ রওশন এরশাদসহ তার পন্থিরা। এ বিষয়ে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন বলেন, পার্টির সব নেতাকর্মীই চান পার্টির পাশাপাশি রিবোধী দলের নেতা হোক জিএম কাদের। তার সাথে পার্টির তৃণমূলের যে সম্পর্ক রয়েছে তাতে তিনি বিরোধী দলের নেতা হলে দল উপকৃত হবে। পার্টির অপর প্রেসিডিয়াম সদস্য এটিইউ তাজ রহমান বলেন, পার্টিতে পারিবারিক দন্ধ বা বিভেদ কাম্য নয়।

সূত্রে বলা হয় জাতীয় পার্টিতে সমস্যাগুলো যত দ্রুত সম্ভব তা মিটিয়ে ফেলা উচিত। এতে পার্টি, পার্টির নেতাকর্মী ও দেশ উপকৃত হবে। সার্বিক বিষয়ে পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা মনোনয়ন প্রশ্নে জোর করে কিছু করা হয়নি। জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চিঠি দেয়া হয়েছে। পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক না করায় বিতর্ক উঠেছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এরশাদ সাহেব যখন বেঁচে ছিলেন তিনিও কিন্তু এভাবে বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছিলেন, আমাকে বিরোধীদলীয় উপনেতা করেছিলেন। পরে আমাকে সরিয়ে রওশন এরশাদকে উপনেতা করা হয়, তখনো কিন্তু পার্লামেন্টারি পার্টির কোনো মিটিং করা হয়নি। তিনি বলেন, আমরা ফোনে সংসদ সদস্যদের জিজ্ঞেস করেছি। তারা সম্মতি দিয়েছে। লিখিত দিতে বলা হলে ১৫ জন সম্মতিপত্র দিয়েছে। ২৫ জনের মধ্যে ১৫ জন সম্মতি দিলে আর কিছু লাগে না। তাই অন্যদের বলা হয়নি। এখন আরো অনেকে দিতে চাচ্ছেন। প্রয়োজন নেই বলে নেয়া হচ্ছে না। জিএম কাদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, অন্য কেউ পার্লামেন্টারি পার্টির সভা ডাকতে পারে না। ডাকতে হলে আমিই ডাকব। তবে বাংলাদেশের জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা এরশাদ ভক্তরা চান যে, এই পার্টি যেন সুন্দর ভাবে তাদের কার্য পরিচালনা করে এবং পার্টির কার্যক্রম আরো গতিশীল করে।

সূত্র: মানবকণ্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *