Wednesday, June 24বাংলারবার্তা ২১-banglarbarta21
Shadow

বড় বাজেট বলে কোন ঘাটতি থাকবেনা কঠিন মোকাবেলা করতেই হবে

বার্তা প্রতিনিধি: বাংলাদেশের বাজেটে আগের বছরগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষায় বড় ঘাটতির বাজেট প্রস্তাব করলেন নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এই বাজেট বাস্তবায়ন যে কঠিন তা অর্থমন্ত্রীর চেয়ে আর কেউ বেশি জানার কথা নয়। তবু তা তো আর দায়িত্বে থেকে বলা সম্ভব নয়। আগের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বড় বাজেট ঘোষণার সময় বাস্তবতাকে এড়িয়ে শুধুই স্বপ্ন দেখাতেন। সেই মুহিতই এবার সাবেক হয়ে বাস্তবতায় ফিরে এলেন, মন্তব্য করলেন, এই বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন, কারণ মানুষ ট্যাক্স দিতে চান না।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

কর আহরণের ব্যর্থতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভঙ্গুরতা এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতার মতো কঠিন পরিস্থিতি সামনে রেখেই ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করলেন অর্থমন্ত্রী। এটি আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেট। তবে অর্থমন্ত্রী কামালের এটি প্রথম বাজেট। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বড় বাজেট দেয়ার চাপেই কি অর্থমন্ত্রী অসুস্থ হয়ে গেলেন? এমন ভাবনা যে কেউ ভাবতেই পারেন। কারণ বাজেট ঘোষণার দুই দিন আগে থেকেই অর্থমন্ত্রী অসুস্থ। বাজেট বক্তৃতার মাঝখানে তাই থামতে হয়েছে তাকে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতার বাকি অংশ পড়ে শোনান। শুধু তাই নয়, আজ শুক্রবার অর্থমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তার স্থলে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

বিকেল তিনটায় জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিনের সভাপতিত্বে সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতা শুরু করেন। এর আগে গতকালই জাতীয় সংসদেই অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেয়। এটি দেশের ৪৮তম, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯তম এবং বর্তমান অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাজেট প্রস্তাব। ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের’ নাম দিয়ে এই বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট এটি।

প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর বাজেটের আকার চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। সে হিসেবে বাজেটের আকার বাড়ছে ৫৮ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে ২০ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা বেশি। বাজেটের এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎসের ঋণই মূল ভরসা। এ ঋণ ব্যাংকিং খাত ও সঞ্চয়পত্র থেকে নেয়া হবে। এ ছাড়া নতুন বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা (জিডিপির ১৩.১ শতাংশ)। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) খাতে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও মূল্যস্ফীতির চাপ ৫.৫ শতাংশে আটকে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর প্রথম বাজেট হওয়ায় এবার বড় গুরুত্ব পেয়েছে নির্বাচনী ইশতেহার। আর তাই দীর্ঘ ৯ বছর পর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তার বলয় ও বরাদ্দের হার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাবও করেছেন অর্থমন্ত্রী। পোশাক খাতসহ দেশীয় শিল্পখাতের বিকাশেও নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।

আগামী অর্থবছরে প্রবাসী আয় দেশে পাঠানোর খরচ বহনে ভর্তুকি দেয়ার জন্য একটি বরাদ্দও থাকছে। পরীক্ষামূলকভাবে শস্য বীমা এবং প্রবাসীদের জন্যও বীমা সুবিধা চালুর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহার অনুসারে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ বাস্তবায়নের ঘোষণাও থাকছে, যাতে পরিকল্পিতভাবে গ্রামকে গড়ে তোলার কথা বলেছেন অথমন্ত্রী।

এই বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভঙ্গুরতা। অর্থায়ন নিশ্চিত করতে অর্থমন্ত্রীর সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর ও নতুন করদাতা সংগ্রহ। পাশাপাশি কর্পোরেট কর হার ও ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা নিয়ে বিভিন্ন মহলের দাবি উপেক্ষা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এসব দাবি মেনে নিলে রাজস্ব আয় কমে যেত বলে আশঙ্কা করেছেন তিনি। পাশাপাশি তামাকজাতীয় পণ্যের ওপর কর বাড়ানোসহ বিভিন্ন লাক্সারি পণ্য ও সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করে মূলত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে চান কামাল। পাশাপাশি করজাল বাড়াতে প্রতিটি উপজেলায় কর কার্যালয় স্থাপনের কথা বলেছেন তিনি। এসব উদ্যোগের ফলে ২০২১ সালে কর-জিডিপি ১৫ শতাংশে উন্নীত করার স্বপ্ন দেখালেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারের ভঙ্গুর অবস্থা বাজেট বাস্তবায়নে বড় টেনশনের কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় ব্যাংক খাতের সংস্কারে ৬টি প্রস্তাব দিয়েছেন। ব্যাংকের মূলধন বৃদ্ধি, ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধন, ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া, সুদের হার এক অঙ্কের উপরে না রাখার মতো প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন প্রণোদনারও প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।

প্রস্তাবিত বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছেন ব্যবসায়ী মহল। ডিসিসিআই সভাপতি ওসামা তাসীর প্রস্তাবিত বাজেটকে একটি ধারাবাহিক বাজেট বলে মন্তব্য করেন, তবে এ ধরনের বড় বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন একান্ত অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন। বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেছেন, ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা পাওয়ার দাবি করলেও ১ শতাংশ পাওয়া মন্দের ভালো।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক সমালোচনা করেছেন বাজেটের। সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টচার্য্য বলেছেন, এই বাজেট আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এখানে কিছু উদ্যোগের কথা বলা হলেও তা কতদিনের মধ্যে হবে তা সুস্পষ্ট করা হয়নি। ড. ফরাস উদ্দিন বলেছেন, বাজেটে ভারসাম্য আনতে হলে আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই। ড. সালেহ উদ্দীন বলেছেন, অর্থনীতির তুলনায় এ বাজেট বড় নয়। তবে আয়ের সংস্থানই বড় চ্যালেঞ্জ।

তবু আশাবাদী অর্থমন্ত্রী। বিগত বছরের উন্নয়নকে রূপকথার উন্নয়নের সঙ্গে তুলনা করে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলায় আমরা এখন এমন এক ক্ষণে এসে উপনীত হয়েছি, যেখান থেকে পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায় অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসার ইতিহাস। সামনে এখনো রয়েছে চ্যালেঞ্জিং পথ পরিক্রমা। কোনো জাতির পথচলা সবসময় সহজ ও সরলরেখায় হয় না, আসে নানা বাধা ও বিপত্তি। কিন্তু আমাদের রয়েছে রুখে দাঁড়াবার ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার অমিত শক্তি। গভীর সঙ্কটেও বাঙালি বার বার সফলভাবে খুঁজে নেয় উত্তরণের পথ।
সূত্র: মানবকণ্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *