Tuesday, June 23বাংলারবার্তা ২১-banglarbarta21
Shadow

চট্টগ্রামে যতসব দুনীতি আর অনিয়ম দেখলেন দুদক চেয়ারম্যান

মিনহাজ, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: হঠাৎ করে চট্টগ্রামে এসে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে দেখলেন সবখানে দুনিীতি আর দুর্নীতি। পরে তিনি গতকাল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে কর্মকর্তাদের সাথে বিশেষ বৈঠকে করে ছাত্র-ছাত্রীরা উপস্থিত আছে তবে কোন শিক্ষক নেই। এটা খুবই দুঃখজনক। ক্লাসে অবশ্যই শিক্ষক থাকতে হবে। আমার বাচ্চা এ প্লাস পেল কিনা সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। যদি ক্লাসে শিক্ষক ভালোভাবে পড়ায় তাহলে এমনিতেই সেই বাচ্চা এপ্লাস পাবে। আগামী দশ বছর যদি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করতে পারি, তা হলে একজন সুশিক্ষিত নাগরিক আমরা পাব।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

শিক্ষার ব্যাপারে কাউকে কোন ধরনের ছাড় দেয়া হবে না। শিক্ষার বিষয়ে দুদক বেশি কঠোর হচ্ছে। দেশের উন্নতি ও অবনতি নির্ভর করে এসব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে দুদক চেয়ারম্যান অনুরোধ করে বলেন, স্কুলের বাচ্চাদের দিকে একটু নজর দিন। তাদের ক্লাসে পড়ান। এপ্লাস পেতে হবে না। তারা ভাল মানুষ হউক। একজন ভাল মানুষ হলেই ভাল নাগরিক আমরা পাব। স্কুলে গিয়ে প্রয়োজনে সততা স্টোর খুলে তাদের সততার শিক্ষা দিন। আমরা তো টাকা দিচ্ছি। এতে ছেলে মেয়েরা ছোটবেলা থেকেই সততা শিখবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। একটার পাশাপাশিই থাকে আরেকটা। দু‘টাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো বাচ্চা মেধাবী হলে চলবে না তাকে স্বাস্থ্যবানও হতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা স্টেশনে (কর্মস্থলে) থাকেন না। এটা অনৈতিক। যেকোন মূল্যে চিকিৎসকদেরকে স্টেশনে থাকতেই হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি আরো বলেন, চিকিৎসকদেরকে এটাসমেন্টে রাখা যাবে না। নিয়ম ভঙ্গ করবেন না। সেবা দেয়ার জন্য ডাক্তারদেরকে গ্রামে থাকতে হবে। গ্রামে থেকেও উচ্চতর ডিগ্রির জন্য পড়াশুনা করা যায়। সরকার প্রচুর ডাক্তার নিয়োগ দিয়েছে। সুতরাং গ্রামের অসহায় মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে হবে। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নানের সভাপতিত্বে সভায় দুদক চেয়ারম্যান প্রধান অতিথি ছিলেন।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার কথা উল্লেখ করে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার ভিত্তি। আমাদের এ ভিত্তিকে শক্ত করতে হলে স্কুলের শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর রাখতে হবে। সকল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে আমাদের বাচ্চাদের খবর নিন। লেখাপড়া কেমন হচ্ছে খবর নিন। দেশে সুনাগরিক গড়তে হলে শিক্ষার খবর রাখতে হবে। জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য শিক্ষা নয়, মানুষ হওয়ার জন্য শিক্ষার প্রয়োজন। সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) ২০৩০ অর্জনের জন্য শিক্ষার বিকল্প নেই মন্তব্য করে ইকবাল মাহমুদ বলেন, রাস্তা ঘাট, দালান, ব্রিজ দেশের সমস্ত উন্নয়ন বৃথা। রাস্তা ঘাট ব্রিজ দিয়ে সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজরা চলাফেলা করলে হবে না, মানুষ চলাফেলা করতে হবে। ফলে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। এতে সুনাগরিক সৃষ্টি হবে। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয় জনগণের জন্য। তাই প্রকল্প গ্রহণ করলে জনগণকে জানাতে হবে। এক্ষেত্রে যেন আমাদের অবহেলা না হয়।

দুদকের নাম ভাঙ্গিয়ে হয়রানির বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক সময় শুনা যায়, দুদকের পরিচয়ে টেলিফোন করার কথা। বাস্তবতা হচ্ছে- দুদক কখনো কাউকে টেলিফোন করে না।
অভিযোগ তদন্ত করতে গেলে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের মুখে শুনি, চাপে পড়ে এটা করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, আমার চাকরি জীবনে চাপ কখনো দেখিনি। আমি চাপের জায়গা সিটি করপোরেশনে (চট্টগ্রাম) চাকরি করেছি। কোন চাপকে পাত্তা দেইনি।

তিনি সংশ্লিষ্টদেরকে হুশিঁয়ার করে বলেন, দুদকের চাপ সহ্য করার ক্ষমতা কারো নেই। আমারও নেই। কারো চাপে বা কথায় কাজ করবেন না। কারন চাপ মানে মাথা নত করা। যে চাকরি করেন সেটি থেকে শুধু বদলি করতে পারবে। প্রয়োজনে বদলি হবেন। উর্ধতনরা চাপ দিলে তা লিখিতভাবে দিতে বলেন। লিখিতভাবে থাকলে যে চাপ প্রয়োগ করে তাকেই ধরা হবে। সব সময় মনে রাখতে হবে, আমরা জনগণের টাকায় জীবন নির্বাহ করি। দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করে জানিয়ে ইকবাল মাহমুদ বলেন, আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করি। সরকারও আমাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে বলে। আমলাতন্ত্রের অনেক বদনাম আছে। কিন্তু ভাল কাজও রয়েছে।

দুদকের মামলাকে ক্যান্সার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দুদক কারো জন্য মামলা করে না, মামলা করার আগেই দুর্নীতি বন্ধ করার নীতিতে আমরা এগুচ্ছি। কারও বিরুদ্ধে দুদকের মামলা হলে ক্যান্সার ধরে যাবে। কাস্টম সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানান, কাস্টম ও আয়কর বিভাগের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। ২০০ লোক কাস্টম হাউসের ফ্লোরে ঘুরে বেড়ায় প্রতিদিন। অথচ তাদের কোন কাজ নেই সেখানে। এসব লোকের জন্য বদনাম হয়। আমরা খোঁজ নিতে যেদিন মানুষ পাঠাই সেদিন আর থাকেন না তারা। কাস্টম কর্তৃপক্ষকে তিনি বলেন, এসব লোকদের বিদায় করুন।

তিনি আরো বলেন, তদবিরবাজরাই দুর্নীতিবাজ। তদবিরবাজরা সক্রিয়। তাদেরকে থামাতে হবে যেকোন মূল্যে। তদবিরবাজদের কারণে ১০ টাকার কাজ ১০ হাজার টাকায় ঠেকে। এতেই জন্ম হয় দুর্নীতির।
বিদ্যুৎ বিভাগ সম্পর্কে ইকবাল মাহমুদ বলেন- বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু ঝামেলা বিদ্যুৎ বিতরণে। লাইন খারাপ, তার পুরাতন ও ট্রান্সফরমার নষ্ট এসব অভিযোগ শুনা যায়। এসব ঠিক করার জন্য তাগাদা দিয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, দায়িত্ব পালন করতে হবে। আরোগ্য লাভের চেয়ে প্রতিরোধ অনেক উত্তম বলেও উদাহারণ দেন এ কর্মকর্তা।

কালচার ও এগ্রিকালচারের মধ্যে দুর্নীতি অনেক কম। তবে নীতির মধ্যে দুর্নীতির বসবাস। এ কারণে আমরা নিজেদের মধ্য থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছি। সম্প্রতি শুধু অভিযোগের ভিত্তিতেই দুদকের এক পরিচালককে চাকুরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। বরখাস্ত করা হয়েছে ২২/২৩ জনকে।
সরল বিশ্বাসে কেউ ভুল করলে তার বিরুদ্ধে মামলা হবে না। এব্যাপারে গ্যারান্টি দিচ্ছি। ভয় পাবেন না। দুদক ভয়ের বস্তু নয়। কাগজপত্রে প্রমাণ না পেলে আমরা মামলা করি না। এর মধ্যে ‘চাপওয়ালা’ কাগজপত্র হলে মামলা হয় না। বিদেশে টাকা পাচারের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, দুইভাবে বিদেশে টাকা চলে যায়। হুন্ডি ও ওভার ইনভয়েসিং এর মাধ্যমে। হুন্ডির মাধ্যমে কম গেলেও ওভার ইনভয়েসিং এর মাধ্যমে টাকা যাচ্ছে বেশি। ওভার ইনভয়েসিং হলে কাস্টম কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী জরিমানা আদায় করেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। কিন্তু যেসব টাকা বিদেশে চলে গেছে সে টাকার কোন খবর থাকে না।

ওভার ইনভয়েসিং এ জড়িতদের ব্যাপারে দুদককে তথ্য দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয় কাস্টম কমিশনারকে। এসময় তিনি সদ্য বদলি হওয়া চট্টগ্রাম কাস্টম কমিশনার ড. একেএম নুরুজ্জামানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বিষয়গুলো জানানোর নিয়ম করার জন্য আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃপক্ষকে ইতোমধ্যে চিঠি দিয়েছি। ওভার ইনভয়েসিং এর জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসের কেইসগুলোর একটি লিস্ট রাখেন। আগামী ১ মার্চ সেই লিস্ট আমাদেরকে পাঠিয়ে দেন।আর এ দেশের মানুষ আয়কর বিভাগকে ভয় পায়। এটাই স্বাভাবিক। এখানে হয়রানির অনেক বিষয় থাকে। মনে রাখতে হবে, কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন। আয়কর সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসুত্রতার কারণে হয়রানির শিকার হন মানুষ।

ভুমি সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সহকারি কমিশনারদের (ভুমি) বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে। অনেকে আবার নিজেদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে সৎ ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে কাজ করছে। তাদেরকে আমরা উৎসাহিত করি। ভূমি অফিসের তহসিলদারদের অনেকে দুর্নীতিগ্রস্ত। অনেক এসি ল্যান্ড তহসিলদারের মাধ্যমে ঘুষ নেন। এদের সাবধান করছি।

যারা বাধ্য হয়ে ঘুষ দেন আমরা তাদেরকে ধরি না। সাহায্য করি। যারা অনৈতিক কাজের জন্য ঘুষ দেন আমরা তাদের দু‘জনকেই ধরি। দক্ষ মানব সম্পদ সৃষ্টির উপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা কামাই করার পর দেখা যায় সেই টাকা খাওয়ার মানুষ কিংবা সামর্থ নেই। এ টাকা কামাই রোধ করে আমাদেরকে দক্ষ মানব সম্পদ সৃষ্টির উপর জোর দিতে হবে। এক্ষেত্রে জাতিকে শিক্ষিত করার কোন বিকল্প নেই। কারণ এ শিক্ষার সাথে সবকিছুরই সংযোগ রয়েছে। শিক্ষা যেন সবকিছুর সেন্টার। আমরা যদি ১০ বছর এ শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে পারি তাহলে একদিকে উন্নত দেশ পাব, আরেক দিকে পাব শিক্ষিত জাতি।

উল্টো পথে গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে কঠোর হুশিঁয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, উল্টো পথে গাড়ি আসলেই ধরবেন (আইনশৃংখলা বাহিনীকে)। ওইসব ড্রাইভারদের ছবি তুলে মিডিয়ায় পাঠিয়ে দেন। রাস্তায় যান চলাচলে বিশৃংখলাই যানজটের প্রধান কারণ। আইন মান্য করার জন্য করা হয়। প্রয়োগ করার জন্য নয়। সবাই যদি আইন না মানি তাহলে সেটা আর আইন থাকে না। ঠিক ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে’র মতো অবস্থা। আমাদেরকে আগে জাগতে হবে। এসময় তিনি ট্রাফিক পুলিশদেরকে এ সংক্রান্ত আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শেখানোর উপর গুরুত্বারোপ করেন। দুনীর্তিবাজদের বিরুদ্ধে চুড়ান্ত হুশিঁয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যা যা করা দরকার সবকিছু করা হবে। সভা শেষে সাংবাদিকদের কোন প্রশ্নের সুযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোন সুযোগ নেই। সব কথাতো বলে দিয়েছি।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নানের সভাপতিত্বে সভায় পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি গোলাম ফারুক, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন, সিএমপি কমিশনার মাহবুবর রহমান, পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা, কাস্টমস, আয়কর, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও অধিদপ্তরের উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। খবর অনলাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *