
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যাম্পাস যেন কোথাও নেই চেনা কোলাহল, দুরন্তপনা, জীবনের উচ্ছ্বাস। যেন এক অচেনা সকাল, অচেনা ক্যাম্পাস। সবকিছুই খোলনলচে বদলে যাওয়া। যে ক্যাম্পাসে ছিল উচ্ছল মুখরতা, সেই আঙিনা এখন শোকের জমিন। নোটিশ বোর্ডে ঝুলছে না কোনো নির্দেশনা বা পরীক্ষার সূচি; সাঁটানো আছে ঝরে পড়া ফুলদের মুখচ্ছবি। ভয়াবহ ট্র্যাজেডির ফল ১২ দিন অনির্ধারিত বন্ধ। যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় হারিয়ে যাওয়া ৩৪ প্রাণের ভার যেন পাহাড়সম! শোক সয়ে এবার দৃপ্ত পায়ে এগোনোর পালা। দুঃসহ ক্ষত বুকে চেপে গতকাল রোববার খুলেছে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দরজা।
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!আরো জানতে পড়ুন: অবশেষে জুলাই সনদের ড্রাফট প্রস্তুত কয়েকদিনের মধ্যে চুড়ান্ত করে ফেলা হবে -জুলাই সনদ-
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ট্রাজেডির পর প্রথমবার রবিবার সকালে একজন শিক্ষকের হাত দিয়ে গেট খোলার পর ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের পা পড়লেও চোখে-মুখে ছিল ভয়ের ছায়া, বিস্ময়ের রেশ। ভাঙা হৃদয় নিয়ে শিক্ষার্থীরা চেনা শ্রেণিকক্ষে পা ফেলেছে নিঃশব্দে, শোকযাত্রার অবয়বে; হারিয়ে ফেলা বন্ধুদের জন্য প্রার্থনা আর চোখের জলে। যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতদের আত্মার মাগফেরাত আর আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনায় আয়োজিত দোয়া ও শোক অনুষ্ঠানে অংশ নেয় নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। বয়স বিবেচনায় শিশু শিক্ষার্থীদের এ আয়োজন থেকে রাখা হয়েছে দূরে। তবু একটা সময় শোকসভা ঢাকা পড়ে বিষাদের চাদরে। অনেক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের বুকের যন্ত্রণা নোনা জল হয়ে ভেসে ওঠে চোখের উঠানে।
বিমানের সেই ভয়াবহ দূর্ঘটনা নিজের চোখে যারা দেখেছেন, সেই দুই চোখে আজ বেদনার অশ্রু। প্রিয় ক্যাম্পাসে ফিরে শিক্ষার্থীরা অন্য রকম এক কষ্টের মুখোমুখি। কেউ কেউ ঘুরে দেখছিল দুর্ঘটনাস্থল; আগুনে পোড়া ভয়াবহতা দেখে কেউ কেউ শিউরে উঠছিল। দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী তাহা বলছিল, এই জায়গাটায় ছোট ছোট শিশু ঘোরাফেরা করত। আজকে ওরা নেই, এই জায়গাটা ফাঁকা। অন্য রকম লাগছে। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়া বলেন, প্রতিদিন যে ভবনের সামনে দিয়ে হেঁটে ক্লাসে যেতাম, আজ সেখানে শুধুই পোড়া গন্ধ।
আরো জানতে পড়ুন: এনসিপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে দিনভর সংঘর্ষ নিহত ৪ কারপিও জারি
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী বলেন, আমার পাশের বাসার এক ছোট ভাই এখানে ক্লাস করত। আন্টি ছোট ভাইয়াটাকে আমার সঙ্গে পাঠাতেন। সে এখনও হাসপাতালে ভর্তি। এখানে এসে ওর কথা বারবার মনে পড়ছে।
ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়ীর যে চত্বর একসময় ছোট ছোট শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর ছিল, সেই চত্বর এখন নিস্তব্ধ। দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নওরোজ আফরিন বলে, কলেজে আসতে ভয় লাগছিল। তাও এলাম, আম্মু সঙ্গে এসেছে। পিচ্চিদের মুখগুলো চোখে ভাসছে, কান্না পাচ্ছে। এভাবে ওদের হারাতে হবে, কল্পনাও করিনি। হঠাৎ কী থেকে কী হয়ে গেল, ভাবতেই পারছি না!
কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আরাফাত বলেন, সকাল সাড়ে ৮টায় এসেছি। কোনো ক্লাস হয়নি। শিক্ষকরা আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, ভালোমন্দ খোঁজখবর নিয়েছেন। পরে দোয়া মাহফিলে অংশ নিয়েছি। এখন বাসায় চলে যাচ্ছি।
দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাহমিদ বলে, এখানে যেটা হয়েছে, সেটা ভোলার মতো না। আমাদেরই প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না এটা হয়েছে। সেদিন ক্যাম্পাসে থাকা কোনো শিক্ষার্থী এটা সহজে ভুলতে পারবে না। যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, যারা হাসপাতালে আছে, তাদের সবার জন্য আমরা অন্তরের অন্তস্তল থেকে দোয়া করেছি।
আরো জানতে পড়ুন: গোপালগঞ্জে এনসিপি নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করেছে আওয়ামীলীগ
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী বেশি হওয়ায় কলেজ শাখার শিক্ষার্থীরা তিন ধাপে (সকাল ৯টা, সাড়ে ১০টা ও দুপুর ১২টা) শোক ও দোয়া অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মাইলস্টোনের লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামালউদ্দীন মিলনায়তনে গিয়ে দেখা যায়, দ্বিতীয় ধাপের শোক ও দোয়া অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। পুরো মিলনায়তন শিক্ষার্থীতে ঠাসা। এই শিক্ষার্থীরা দুঃসময়ে ক্যাম্পাসে ফিরেছে শুধু একে অপরের মুখ দেখতে, একে অপরের যন্ত্রণার ভাগ নিতে। মাইলস্টোনের শোকসভার মিলনায়তনজুড়ে কালো ব্যানার, ফুল আর মোমবাতি। নিঃসীম শোকের মাঝে দাঁড়িয়ে কথা বললেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল (অব.) নুরন নবী। তাঁর কণ্ঠে ছিল অসহায় আর্তি, ‘২৭টা শিশু নিঃশেষ হয়ে গেল! কীভাবে মেনে নেব এই শোক? কী বলব সেই মা-বাবাদের, যাদের ঘর এখন শূন্য?’ তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন আমাদের দুজন শিক্ষক। পাঁচজন শিক্ষক এখনও হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন। সঙ্গে আছে আরও ৩৩ শিক্ষার্থী। আমি অনেকের বাসায় গিয়েছি, যারা তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন। মা নির্বাক হয়ে আছেন, কথা বলতে পারছেন না। বাবাও শোকে পাথর।
বিমার দূর্ঘটার শোক কাটিয়ে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম চলছে বলে জানান মাইলস্টোন কলেজের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন (অব.) জাহাঙ্গীর খান। তিনি বলেন, আমরা এখনও দুর্ঘটনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তবে সবার সহযোগিতায় আবারও এগিয়ে চলার চেষ্টা করছি। অভিভাবকরা চাচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আসুক। একজন আরেকজনের সঙ্গে দেখা হলে, শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বললে, তাদের ভেতরে যে আতঙ্ক আছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। তাই আগামী বুধবার থেকে পাঠদান শুরু হবে। কলেজের এই গুমোট পরিবেশ থেকে আমরা বের হতে চাই।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ম্যানেজমেন্ট পরিকল্পনা করতেছেন দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্পাসে মানসিক সহায়তা কার্যক্রমের। আগামী তিন মাস চলবে ধারাবাহিক কাউন্সেলিং। বিমানবাহিনীর সহায়তায় কলেজে চলছে মেডিকেল ক্যাম্প, যেখানে শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে মানসিক ও শারীরিক সহায়তা। ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। কলেজের আরেক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম বলেন, আমরা আহত, তবে ভেঙে পড়িনি। আমরা ঘুরে দাঁড়াতে চাই। বিভ্রান্তি নয়, সহানুভূতি ও মানবিকতা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাই। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে শিক্ষকরা তাদের সঙ্গে কথা বলবেন। এ মুহূর্তে আমাদের কেউ নিখোঁজ নেই। যাদের তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি, তাদের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। নিহতদের তালিকা কলেজের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে বিভ্রান্তি না থাকে।
বিমান দূর্ঘনার পর বিষাদে মোড়ানো মাইলস্টোন কলেজ হয়ে উঠেছে মানবিকতার প্রতীক। যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক একসঙ্গে কাঁদে, আবার একসঙ্গে উঠে দাঁড়ানোর শপথ নেয়। পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও এখন শিক্ষার্থীদের শিখতে হচ্ছে শোকের নতুন অর্থ, একে অপরের পাশে দাঁড়ানো, আবারও ঘুরে দাঁড়ানো। শিক্ষার্থীরা শিখছে, প্রিয়জন হারানোর পরও জীবনের দিকে ফিরে তাকাতে হয়। শূন্যতা বুকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হয়।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ বুলবুল বলেন, এই দুঃসময়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সহানুভূতি ও মানবিকতা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সবচেয়ে বড় শক্তি। বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পুরোদমে সব শ্রেণির ক্লাস শুরু হবে।
কোমল শিক্ষার্থীদের ক্ষতবিক্ষত ছবি-ভিডিও ঝাপসা করার নির্দেশ
উত্তরার দিয়াবাড়ী মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকাশিত ও প্রচারিত ক্ষতবিক্ষত ছবি ও ভিডিও ঝাপসা করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল রোববার এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বিটিআরসিসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুলসহ এ আদেশ দেন।
উত্তরার দিয়াবাড়ীর ওই ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের ছবি-ভিডিও সরাতে এবং সেগুলো ছড়িয়ে পড়া বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তাসমিয়াহ নুহিয়া আহমেদ গত ২৯ জুলাই এ রিট করেছিলেন।

